পপসম্রাট আজম খানের জীবনী


আজম খানের বেড়ে ওঠা : ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরের ১০ নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। বাবা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান ও মা জোবেদা বেগম। বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী ও মা ছিলেন সংগীতশিল্পী। মায়ের মুখেই গান শুনতে শুনতেই গড়ে ওঠে গানের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক । ১৯৫৬ সালে আজিমপুরের সরকারি বাসা ছেড়ে কমলাপুরের জসীমউদ্দীন রোডে নিজেদের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬৮ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। উঠতি বয়সে বড় ভাইদের গানের চর্চা দেখে তীব্রভাবে ঝুঁকে পড়েন সঙ্গীতের মায়াজালে। বিভিন্ন এলাকার বন্ধুদের বাড়ির ছাদে বসে জমে উঠতো গানের আসর। হেমন্ত, শ্যামল মিত্র, মুখেশ, মুহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার সহ দেশ-বিদেশের নানান শিল্পীর গানে মাতিয়ে রাখতেন আসর। ১৯৮১ সালের ১৪ই জানুয়ারি তিনি সাহেদা বেগমকে বিয়ে করেন।

পপগায়ক আজম খান: গায়ক হিসেবে বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন আজম খান। দেশকে স্বাধীন করার জন্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রাইফেল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্বাধীন দেশে রাইফেল ছেড়ে ফিরে যান গানের জগতে। সত্তরের দশকে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে এদেশে পপসঙ্গীতের সূচনা করেন। ভিন্ন মাত্রার গায়কী ও পরিবেশনা দিয়ে অল্পদিনেই শ্রোতাপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সেসময় তার সঙ্গে দেশের সঙ্গীতের এ নতুন ধারায় যুক্ত হন শিল্পী ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, নাজমা জামানসহ সদ্যপ্রয়াত পিলু মমতাজের মতো সময়ের একঝাঁক তরুণ প্রতিভা। পপগানে তুমুল জনপ্রিয়তা আজম খানকে এনে দেয় পপসম্রাটের খেতাব। পপগানের এই রাজাকে কেউ কেউ পপগুরু বলে সম্বোধন করতেও পছন্দ করতেন। এদেশে পপ তথা ব্যান্ড সঙ্গীতের অগ্রপথিক ও কিংবদন্তি শিল্পী আজম খান।
১৯৭২ সালে নটরডেম কলেজের একটি অনুষ্ঠানে প্রথম মঞ্চে গান শোনান পপগুরু আজম খান। তখনও এদেশে প্রচলিত হয়নি কনসার্ট নামের সঙ্গীতানুষ্ঠান। ১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রথম কনার্ট হয় ওয়াপদা মিলনায়তনে। সেখানে এক মঞ্চে গান গেয়েছিলেন আজম খান, ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফকির আলমগির ও পিলু মমতাজ। ১৯৮২ সালে বের হয় তাঁর প্রথম ক্যাসেট ‘এক যুগ’। সব মিলিয়ে তাঁর অডিও ক্যাসেট ও সিডির সংখ্যা ১৭টি। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকে বৈচিত্র্যময় কথার নানা পপগান গেয়ে তারুণ্যের হৃদয়ে উন্মাতাল আনন্দের ঝড় তুলেছেন। তার অগণিত জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, আলাল ও দুলাল, ওরে সালেকা ওরে মালেকা, অভিমানী, আমি যারে চাইরে, হাইকোর্টের মাজারে, এত সুন্দর দুনিয়ায়, জীবনে কিছু পাব নারে, পাঁপড়ি কেন বুঝে না, চার কলেমা সাক্ষী দিবে এবং ও চাঁদ সুন্দর রূপ তোমার ইত্যাদি।

মুক্তিযোদ্ধা আজম খান : মুক্তিযুদ্ধেও বীরোচিত ভূমিকা রেখেছেন পপসম্রাট আজম খান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জীবনকে বাজি রেখে অংশ নিয়েছেন অসংখ্য গেরিলা যুদ্ধে। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার মেলাঘরে। প্রশিক্ষণ শেষে দেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। অস্ত্র হাতে প্রথম লড়াই করেন কুমিল্লার সালদাহে। এরপর ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ী হয়ে লক্ষানদী, বালুনদী, গুলশান, ইসাপুর ও ক্যন্টনমেন্টের পাশ পর্যন্ত নানা স্থানে অংশ নিয়েছেন গেরিলা অপারেশনে। যুদ্ধকালীন সময় ডেমরার তিতাস মিশন শেষ করে ফেরার পথে নৌকাডুবিতে বিপর্যয়ে পড়েন তিনি। নদীর তলদেশের লতায় পা আটকে যাবার ফলে সাঁতার কাটা দুরহ হয়ে পরে। অস্ত্র টানার নৌকা জড়িয়ে ধরে আত্নরক্ষা করেন তিনি।

অভিনয় জীবন : খেয়ালি মানুষ ছিলেন আজম খান। গানের বাইরে বিভিন্ন জনের অনুরোধে অভিনয়ও করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে হীরামনে কালা বাউলের চরিত্রে অভিনয় করেন। ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ সিনেমায় ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া বাংলালিংক, ক্রাউন এনার্জি ডিংঙ্সসহ বেশকিছু বিজ্ঞাপনেও কাজ করেন।

অসুস্থতার দিনলিপি: ২০১০ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা নামক মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন আজম খান। প্রথমে তাকে বঙ্গুবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৪ জুলাই তিনি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে ইএনটি হেড-নেক সার্জন বিভাগের প্রধান অ্যান্ড্রু লয় হেং চেংয়ের তত্ত্বাবধানে আজম খানের মুখে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। ৭ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় তাকে পুনরায় সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে মোট ৩০টি রেডিওথেরাপি ও ৫টি কেমোথেরাপি দেয়ার কথা থাকলেও আজম খান ২১টি রেডিওথেরাপি ও ১টি কেমোথেরাপি নিয়ে ২৭ ডিসেম্বর দেশে ফিরেন আসেন। সম্পূর্ণ কোর্সটি সম্পন্ন করা সমর্থন করেনি তাঁর শরীর। ২০১১ সালের ২২ মে হঠাৎ বাম হাতে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৭ মে গুরুতর অসুস্থ হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়। এরপর স্কয়ার থেকে ১ জুন সিএমএইচে স্থানান্তর করা হয় তাঁকে। ৫ জুন রবিবার সকাল ১০.২০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি এ শিল্পী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।

এই লেখাটি পিসি হেল্পলাইন বিডি.কম এ প্রকাশিত হয়েছে ‘শীর্ষ নিউজ ডটকম’ থেকে।

4 thoughts on “পপসম্রাট আজম খানের জীবনী

  1. ZAKIR HOSSAIN বলেছেন:

    পপসম্রাট আজম খানকে নিয়ে সুন্দর এই লেখার জন্য ইমরান হাসান আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই তার বীরত্ব গাঁথা জীবনী আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য। একটি জিনিষ মনে হয় উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন মনে হয়, তিনি নিজে ক্রিকেট খেলতেন এবং ক্রিকেট কে ভালবাসতেন।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s